
ঢাকায় ইসলামি সংগীতের অগ্রগামী সংগঠন কলরব শিল্পীগোষ্ঠী-এর শত কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন ঘিরে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রিয় ইসলামি সংগীতশিল্পী ও কলরবের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আইনুদ্দীন আল আজাদ-এর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে সংগঠনের রাজস্ব আয়ের বিশাল অংশ তাঁর পরিবার বা গান সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের কাছে না পৌঁছে একটি সুবিধাভোগী চক্রের হাতে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত শিল্পীরা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে সম্পদ
ওয়েলকাম টিউন বা কলার টিউনের মাধ্যমে আইনুদ্দীন আল আজাদ ও অন্যান্য শিল্পীদের গাওয়া ইসলামি গানগুলোর বিপুল জনপ্রিয়তা থেকে মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় হলেও, সেই অর্থের সঠিক হিসাব পাচ্ছেন না স্বত্বাধিকারী বা শিল্পীরা।
কলরবের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক বদরুজ্জামান উজ্জ্বল এবং প্রধান পরিচালক রশিদ আহমেদ ফেরদৌস-এর বিরুদ্ধে সংগঠনের সম্পদ, রয়্যালটি এবং মোবাইল টিউন আয়ের টাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যক্তি সম্পত্তিতে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে।
আইনুদ্দীনের স্ত্রী হাবিবা আজাদ লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, “স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর কোনো গান বা কর্মের রয়্যালটি আমাদের দেওয়া হয়নি। আমার সন্তানদের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।”
তিনি জানান, সন্তান আব্দুল্লাহহিল গালিব ঢাকার একটি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছে এবং মাসিক ৩৫০০ টাকা বেতন সংগ্রহের জন্য তাকে কলরব অফিসে গিয়ে বসে থাকতে হয়।
কোটি টাকার রাজস্ব, অথচ প্রতিষ্ঠাতার পরিবার বঞ্চিত
২০০৪ সালের ২৮ মে প্রতিষ্ঠিত কলরব শিল্পীগোষ্ঠী ধীরে ধীরে ইসলামি সংগীতের মূলধারায় প্রবেশ করে। মোবাইল ফোনে ওয়েলকাম টিউন হিসেবে ইসলামি গান ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনুদ্দীনের গানগুলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায়।
২০১০ সালে মৃত্যুর আগে আইনুদ্দীন ‘বিটুএম টেকনোলজিস লিমিটেড’-এর সঙ্গে চুক্তি করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, একজন কলার টিউন ব্যবহারকারী মাসে ৩০ টাকা পরিশোধ করতেন, যার মধ্যে শিল্পী বা স্বত্বাধিকারী পেতেন ৩ টাকা ৭৫ পয়সা।
২০১১ সালেই বদরুজ্জামান নিজেই স্মারকগ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, আইনুদ্দীনের গানের ইউজার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ লাখ। হিসাব অনুযায়ী, শুধু তাঁর গানে থেকে আয় হওয়ার কথা দেড় কোটি টাকার বেশি। পুরো কলরবের গানে আয় দাঁড়ায় ৩ থেকে ৬ কোটি টাকা।
কিন্তু সাবেক পরিচালক, অর্থ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, এই আয়ের বড় অংশ বদরুজ্জামান নিজে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কোনো স্বচ্ছতা বজায় রাখেননি।
সংগঠনের সম্পদ দখলের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, কলরবের ইউটিউব চ্যানেল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যক্তিগত কোম্পানি হলি টিউন-এর নামে রি-ব্র্যান্ড করা হয়েছে। চ্যানেলের নাম থেকে ‘কলরব’ বাদ দিয়ে নিজেদের কোম্পানির নাম ব্যবহার করা হয়। একইভাবে কলরবের অর্থে ফ্ল্যাট কেনা হলেও তা ব্যক্তি নামে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্রাইট সলিউশন মাল্টিমিডিয়া নামে একটি কোম্পানি গড়ে তুলে সংগঠনের আয়ের উৎসগুলো ব্যক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এমন অভিযোগ রয়েছে বদরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
সাবেক অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “বদরুজ্জামান প্রথমদিকে কয়েকটি বিল এনে মোবাইল কেনার দাবি করেন। পরে তাকে ব্যাংক লেনদেন নিশ্চিত করতে বলা হলে তিনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান।”
প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় মুছে ফেলার অপচেষ্টা?
আইনুদ্দীন আল আজাদের পরিবারের অভিযোগ, ধীরে ধীরে সংগঠনের যাবতীয় কাগজপত্র ও কপিরাইট থেকে প্রতিষ্ঠাতার নাম সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। ফেসবুক পেজে প্রতিষ্ঠাতার নাম থাকলেও আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রে রশিদ আহমেদ ফেরদৌস ও বদরুজ্জামানকে সংগঠনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আইনুদ্দীনের বড় ভাই সামছুল আলম বলেন, “আমার ভাই মারা যাওয়ার পর আমরা বদরুজ্জামানকে দায়িত্ব দিই। কিন্তু সে এখন সম্পূর্ণ দখল করে নিয়েছে। আমার ভাইয়ের সন্তানদের হক রক্ষায় আমি সবার সহযোগিতা চাই।”
বিপরীতে নেতাদের আত্মপক্ষ সমর্থন
অভিযোগের বিষয়ে বদরুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, “আমরা পরিবারকে যথাসম্ভব সহায়তা করেছি, মেয়ের বিয়ের খরচও দিয়েছি। কলরব থেকে আয় নেই, নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়েছি।”
রশিদ আহমেদ ফেরদৌস বলেন, “আইনুদ্দীনের পরবর্তী নেতৃত্বের মাধ্যমেই সংগঠনের বিস্তার ঘটেছে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ, সেটাই আমরা করছি।”
তিনি আরও দাবি করেন, আইনুদ্দীনের বেশিরভাগ গানের স্বত্ব তিনি ‘প্রত্যয় প্রডাক্টস’ নামক এক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে গেছেন।
প্রত্যয় প্রডাক্টস-এর মালিক মুফতি মস্তোফা কামাল বলেন, “আমাদের মধ্যে পার্টনারশিপ ছিল। আমি অর্থ দিতাম, তিনি গান তৈরি করতেন। গানগুলোর মালিকানা যৌথ।”
জনপ্রিয় ইসলামি সংগীত শিল্পী আইনুদ্দীন আল আজাদের প্রতিষ্ঠিত কলরব শিল্পীগোষ্ঠী আজ শত কোটি টাকার এক প্রতিষ্ঠান। অথচ এর প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের দাবি অনুযায়ী, তাঁরা রয়েছেন অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার মধ্যে।
সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নেতৃত্বের জবাবদিহির অভাব রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্পীর পরিবার, সংশ্লিষ্ট শিল্পী এবং ধর্মপ্রাণ শ্রোতারা চাইছেন একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান এবং শিল্পী স্বত্ব সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হোক।
সূত্র:
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেশ রূপান্তর