ময়মনসিংহ থেকে ‘নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন’ এর সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে মো: রাকিব আল হাসান নামের এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। গত ১০ জুলাই আটকের পর ময়মনসিংহ কোতয়ালী থানায় রাকিবের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
রাকিবের বাড়ি শেরপুর সদরের গাজীর খামার এলাকায় হলেও তিনি ময়মনসিংহ শহরে একটি মেসে থাকতেন। সেখান থেকেই তাকে আটক করা হয়।
রাকিবের বাবা দিনমজুর লাল চাঁন মিয়াও দ্য ডিসেন্ট-কে ছেলের গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকেই গ্রেফতারের খবর জানতে পারেন।
“ময়মনসিংহ ডিবি অফিসে গিয়ে রাকিবের সাথে দেখা করছি। কলেজে পড়ার জন্য শহরে থাকতো আমার ছেলে। আমি গরিব মানুষ, কিছুই বুঝতেছি না কী হইছে।”
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত রাকিব ময়মনসিংহ নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মামলার এজাহারে রাকিবের বয়স ২০ উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, গত ১০ জুলাই রাতে কোতয়ালী থানার সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরদিন ১১ জুলাই কোতয়ালী থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাকিবকে আদালতে পেশ করা হলে বিচারক ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে গত ১৭ জুলাই তাকে পুনরায় আদালতে পেশ করা হলে তাকে জেল হাজতে পাঠান আদালত।
ময়মনসিংহ কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি শুধু মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এজাহারে ‘নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন’ এর সাথে যুক্ত থাকার কথা বলা হলেও কোন নিষিদ্ধ সংগঠন তা উল্লেখ করা হয়নি।
তবে মামলার বাদী এটিইউ’র উপপরিদর্শক পলাশ আলীর সাথে কথা হলে তিনি জানান রাকিবকে ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মফিজুল ইসলামের সাথ কথা বললে তিনি রাকিবকে আটক ও রিমান্ডে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এন্টি টেররিজম ইউনিটের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার ব্যারিস্টার মাহফুজুল হক জানান তিনি ছুটিতে রয়েছেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত রাকিব ফেসবুকে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে উগ্রবাদী কনটেন্ট প্রচার করেছেন এবং অন্যান্য সদস্যদের সাথে তা আদান-প্রদান করেছেন।
এছাড়াও বলা হয়েছে, তার নিজ নাম ও ছদ্মনামে ১২টি ফেসবুক আইডি ব্যবহার করতেন রাকিব। তার ১৯টি জিমেইল আইডিসহ, ইমু, টেলিগ্রাম ও এক্স আইডি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে।
রাকিবের নিজের নামে খোলা একটি আইডির বিভিন্ন পোস্ট যাচাই করেছে দ্য ডিসেন্ট। যদিও গত ২৩ জুলাইয়ের পর থেকে তার নামে থাকা আইডিসহ বাকি ছদ্মনামের আইডিগুলো আর সক্রিয় নেই।
রাকিব তার মূল আইডিতে নিজের বিভিন্ন ছবি আপলোড করতেন যার বেশিরভাগই ছিল একটি জিমে ব্যায়ামরত অবস্থার। নিজের এমন একটি ছবি শেয়ার দিয়ে রাকিব ইংরেজিতে ক্যাপশন দিয়েছেন “জন দ্য জিহাদি”।
কভার ফটোতে নিজের ছবির সাথে এডিট করে আইএস এর পতাকা যুক্ত করে পোস্ট করেছেন এবং ক্যাপশন দিয়েছেন ‘Soldier of IS’.
রাকিবের ফেসবুকে আইডিতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস’র মতাদর্শের পক্ষে দেয়া বিভিন্ন পোস্ট পাওয়া গেছে।
গত ১৩ জুন একটি পোস্টে আইএস এর সাবেক প্রধান আবু বকর বাগদাদীর একটি ভিডিও বক্তব্য শেয়ার দিয়ে রাকিব ক্যাপশন দিয়েছেন, “আমাদের যুবরাজ, কুফফারদের আব্বু।”
২৪ মে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশন দিয়েছেন, “বিদ্রোহী, বিপ্লবী, মৌলবাদী, আমি জঙ্গিবাদী।”
রাশিয়ান নাগরিককে জবাই করে হত্যার একটি ভিডিও পোস্ট করে রাকিব লিখেন, “রাশিয়ান শুওর জবাই করছি মালুদের খাওয়াবো, মালুদের জবাই করে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো।”
আরেকটি ভিডিওতে লিখেন, “হে আমার জাতি, ভোর এসে গেছে।”
আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ আল-কায়দা ও ওসামা বিন লাদেনের সমালোচনা করছেন এমন ভিডিও পোস্ট দিয়ে লিখেছেন: “ওসামা তোমার আব্বো, তোমার ডেডি।”
শিয়া মুসলিমদের একটি মসজিদ ধ্বংসের ভিডিওতে রাকিব লিখেছেন: “পিতা ইব্রাহীম আ: এর সন্তানেরা শিরকের কারখানা, শিয়াদের মন্দিরগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে সমান করছে।”
দেলোয়ার হোসাইন সাইদীর গণতন্ত্র সম্পর্কিত বক্তব্য নিয়ে রাকিব লিখেছেন: “বেডা লেহাপরা করো, বড় হুগুর জেহেতু বলেচে তাহলে অইতো ঠিগি বলেছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সিরাজুল ইসলাম বলেন, “রাকিব অল্প কিছুদিন আগে ওই বাসায় ওঠে। পুলিশ তাকে আটক করার পর আমাদের সামনে তাকে ফেসবুক খুলে দেখাতে বলে। সেখানে তার আইডিতে আইএসের পক্ষে প্রচারণা চালানো বিভিন্ন পোস্ট দেখেছি।”
রাকিবের বাবা লাল চাঁন বলেন: “আমি সরল সোজা মানুষ, আমি গরীব একটা মানুষ। বড় আশা করে ছেলেকে পড়ালেখা করতে দিছি ময়মনসিংহ।”
তিনি বলেন: “জেল থেকে ফোন করার পর তিনি গ্রেফতারের বিষয়টি জানতে পারেন। রিমান্ড চলাকালে ময়মনসিংহ ডিবি অফিসে গিয়ে দেখা করেছেন ছেলের সাথে।”
ছেলের বিষয়ে বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা লাল চাঁন।
“আইডি খুলে ছবি দিছে। আইডি আবার নষ্ট হয়ে গেছে। পরে আরেক আইডি খুলছে।”
“একবার ছেলে বলছিল আমার এক বড় ভাই আছে। আমি বলছি বাবা বড় ভাই দিয়া কী করবা। তুমি লেখাপড়া নিয়া থাকবা।”