বিগত এক দশকে জাতিসংঘ কর্মীদের দ্বারা সারা বিশ্বে প্রায় ৬০ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন—এমন ভয়াবহ তথ্য সামনে এনেছেন জাতিসংঘের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাসেলিওড। এই বিস্ফোরক তথ্য তিনি ২০২৪ সালে ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়কমন্ত্রী প্রিতি পাটেলের হাতে তুলে দেন।
অধ্যাপক ম্যাসেলিওডের দাবি অনুযায়ী, জাতিসংঘের বিভিন্ন দাতা সংস্থায় বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ শিশু নিপীড়ক কর্মরত রয়েছেন। তাদের অনেকে শুধুমাত্র নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানোর উদ্দেশ্যেই এসব পদে নিয়োগ নিতে আগ্রহী হন। এ ধরনের তথ্য প্রায় দুই দশক ধরে চেপে রাখা হলেও, অবশেষে তা প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি বলেন, “যদি আপনার গায়ে ইউনিসেফ বা জাতিসংঘের টি-শার্ট থাকে, তাহলে কেউ আপনাকে প্রশ্ন করবে না আপনি কে বা আপনার উদ্দেশ্য কী। তখন আপনি যা খুশি করতে পারবেন।”
অধ্যাপক ম্যাসেলিওড আরও জানান,
“যে মাত্রায় যৌন নিপীড়ন জাতিসংঘে হয়ে আসছে, তা ক্যাথলিক চার্চের যৌন কেলেঙ্কারির ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।”
তিনি নিজে জাতিসংঘের ত্রাণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন বলকান, রুয়ান্ডা ও পাকিস্তানে। পরে তিনি জাতিসংঘের জরুরি সমন্বয় কেন্দ্রের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি শিশু ও নারী নিপীড়কদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং যুক্তরাজ্যকে এতে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ম্যাসেলিওডের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সালে জাতিসংঘের বেসামরিক কর্মীরা ৩১১ জনকে নিপীড়ন করেছেন, আর জাতিসংঘ স্বীকার করেছে যে প্রকৃত সংখ্যা তাদের প্রকাশিত তথ্যের দ্বিগুণ হতে পারে। যুদ্ধ এলাকার বাইরের ঘটনাগুলো তো একেবারেই রেকর্ডবিহীন। তাঁর মতে, প্রতিটি ১০টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে মাত্র ১টি রেকর্ড করা হয়।
তিনি প্রমাণসহ এ বিষয়টি তুলে ধরার পরেও জাতিসংঘ এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর তদন্ত শুরু করেনি। সাবেক মন্ত্রী প্রিতি পাটেল অভিযোগ করেন, ডিএফআইডি (DFID) কর্মকর্তারা এসব তথ্য চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি তাঁকে বলা হয়, যেন বক্তব্যে কেবল শান্তিরক্ষী বাহিনীর দায়ের কথাই তুলে ধরা হয়, বেসামরিক কর্মীদের অপরাধ গোপন রাখা হয়।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের সহযোগী কনর বার্নস জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভয়াবহতা উল্লেখ করে বলেন,
“যা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল বরফের উপরিভাগ মাত্র। এর গভীরে কী হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।”
পেনি মর্ডান্ট ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে জাতিসংঘে অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন, যদি এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনও তদন্ত শুরু হয়নি বলে জানায় ডিএফআইডি।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার ও ত্রাণ সংস্থা হিসেবে পরিচিত জাতিসংঘ এখন নিজেরই কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ অভিযোগের মুখে। বিশ্বের জনগণের করের অর্থ দিয়ে চলা এই সংস্থায় শিশু ও নারী ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে।
তবে জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।
সূত্র: দ্য সান (The Sun), ব্রিটেন