চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিছক কোনো অসাম্প্রদায়িক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয় ; বরং এটি এই কওমের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রযন্ত্র গতকাল ঘোষণা করেছে— চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে কোনো “উস্কানিমূলক কার্যক্রম” দেখা দিলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেবে। শুধু তাই নয়, চন্দ্রনাথ পাহাড়কে “চন্দ্রনাথ ধাম” হিসেবেও আখ্যা দিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, উস্কানি আসলে কারা দিচ্ছে? মুসলিমরা, যারা সারাদেশে যুগে যুগে নির্যাতন, হত্যা, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির শিকার? নাকি, হিন্দুত্ববাদীরা, যারা বারবার নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন দিয়ে, নিজেরাই প্রতিমা ভেঙে, নিজেরাই সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে মুসলিমদের দায়ী করেছে?
১। ভোলা, বোরহানউদ্দিন (২০ অক্টোবর ২০১৯) :
রাসূল ﷺ এর অবমাননার প্রতিবাদে মুসলিমরা রাস্তায় নেমেছিল সেদিন। কিন্তু অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করে পুলিশ মুসলিমদের গুলি করে হত্যা করে। শহীদ হলো নবীপ্রেমিক জনতা।
২। রমজান, ২০১৪ :
তারাবীর সালাতের সময় রথযাত্রার নাম করে মসজিদে হামলা হলো…
৩। সিলেট, কাজলশাহ (২০১৬) :
জুমুআর সময় লাউড স্পিকারে গান চালিয়ে নামাজে ব্যাঘাত ঘটানো হলো…
৪। রংপুর (২০১৭) :
টিটু রায় নবী অবমাননা করল…
৫। নাসিরনগর (২৯ অক্টোবর ২০১৬) :
রসরাজ দাস ফেসবুকে কাবাঘরের সাথে শিবের ছবি জুড়ে দিল…
৬। প্রিয়া সাহার ভণ্ডামি (২০১৯) :
নিজেই ঘরে আগুন দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে কান্নাকাটি করল…
৭। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজ্ঞাপন (১২ মে ২০১৯) :
দাড়ি রাখা, টাখনুর উপর কাপড় পড়াকে ‘জঙ্গিবাদের সূচক’ বানিয়ে…
৮। ইসকনের প্রসাদ ষড়যন্ত্র (জুলাই ২০১৯) :
চট্টগ্রামের ৩০টি স্কুলে কোমলমতি শিশুদের দিয়ে “হরে কৃষ্ণ” মন্ত্র পড়িয়ে প্রসাদ খাওয়ানো হলো…
৯। ফরিদপুর, এপ্রিল ২০২৪ :
লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে উগ্র হিন্দুরা নিজেদের মন্দিরে আগুন দিয়ে দুই মুসলিম নির্মাণ শ্রমিক আশরাফুল ও আসাদুলকে হত্যা করলো…
১০। ২৫ অক্টোবর, ২০২৪ :
লালদীঘি ময়দানে সনাতনী জাগরণ মঞ্চের সমাবেশের দিন…
১১। চিন্ময় দাস গ্রেফতার (২৫ নভেম্বর ২০২৪) :
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী ধর্মগুরু চিন্ময় দাসের গ্রেফতারের পর…
১২। আলিফ হত্যায় জড়িত বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শুভ কান্তি দাশ একজন সক্রিয় ইসকন কর্মী…
১৩। আবরার ফাহাদ হত্যা (২০১৯) :
ইসকনের সদস্য বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা ছিল আবরার ফাহাদের হত্যার অন্যতম নেপথ্য কারিগর…
১৪। হাজারী গলির ঘটনা (৫ নভেম্বর ২০২৪) :
“ইসকন বিরোধী পোস্ট” দেওয়ায় এক মুসলিম ব্যবসায়ীর দোকানে হামলা চালানো হয়…
১৫। আরএসএস পতাকা ব্যবহার :
বাংলাদেশে সনাতনী জাগরণ মঞ্চ সহ অন্যান্য সংগঠনের ছদ্মাবরণে…
১৬। চট্টগ্রাম আদালত, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ :
“একটা একটা মোল্লা ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”— চট্রগ্রাম কোর্ট পাড়ায় এই স্লোগান দেওয়া হলো প্রকাশ্যে…
১৭। উগ্র হিন্দুরা প্রকাশ্যে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠায়…
১৮। মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম হননের এজেন্ডা নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে “ভাগওয়া লাভ জিহাদ”…
১৯। প্রতি বছর প্রতিমা ভাঙচুরের নাটক সাজানো হয়…
২০। প্রতিটি পূজায় ত্রিশূল, রামদা দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র হাতে মহড়া দেয় হিন্দুরা…
এগুলোই কি উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড নয়? এগুলোই কি এই বাংলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রকৃত চিত্র নয়? অথচ, চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ইস্যুতে রাষ্ট্র আজ পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো করে হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে…
চন্দ্রনাথ পাহাড় নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের যে মিথ্যা আখ্যান দাঁড় করানো হচ্ছে, তা কোনো নিরীহ কাল্পনিক ধর্মীয় ইতিহাস নয়। এটি সেই নকশা, যা অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ গুড়িয়ে দিয়ে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় আমরা দেখেছি।
প্রথম ধাপ: “প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ” আবিষ্কারের দাবি।
দ্বিতীয় ধাপ: সেই কল্পিত ইতিহাসকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে মন্দির নির্মাণ।
তৃতীয় ধাপ: মন্দিরকে “ঐশ্বরিক স্থাপনা” ঘোষণা করে স্থায়ী দখলদায়িত্ব কায়েম।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে কাছাকাছি অবস্থানে হওয়ায় ভারতের কাছে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের রয়েছে কৌশলগত সামরিক গুরুত্ব।
চন্দ্রনাথ পাহাড়কে “শক্তিপীঠ” আখ্যা দিয়ে হিন্দুত্ববাদী তীর্থযাত্রীদের অনুপ্রবেশ কার্যত…
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে হিন্দুত্ববাদীদের তীর্থযাত্রাকে ঘিরে পর্যটন ব্যবসা, জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় মুসলমানদের উচ্ছেদ— এসব শুরু হলে…
চন্দ্রনাথ পাহাড়কে কেন্দ্র করে তীর্থযাত্রা সম্প্রসারণের অর্থ হলো সীমান্ত অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
সুতরাং, সরকার যদি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ইস্যুতে হিন্দুত্ববাদীদের পাশে দাঁড়ায়, তবে ইতিহাস সাক্ষী থাকবে— এটাই ছিল বাংলাদেশের ভৌগলিক অখণ্ডতা বিক্রির সূচনা।
-আবু উসামা