জাতিসংঘের অধীনে গঠিত OHCHR বা মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার অফিস বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করলেও বাস্তবতা হলো— এই প্রতিষ্ঠান মূলত পশ্চিমা আধিপত্যবাদী কাঠামোর একটি “সফট পাওয়ার মডিউল”। এটি সরাসরি বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক অবকাঠামোকে প্রভাবিত করার এক ‘সফট টুল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্ব, মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র বা খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ দেশে এই কমিশন সরাসরি প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর নীতিনির্ধারণে হস্তক্ষেপ করে।
“মানবাধিকার সংরক্ষণ”, “আইনের সুশাসন”, “জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ”, “নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ”, “গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”— এ ধরণের উপনিবেশিক শব্দাবলীর আড়ালে শুরু হয় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া।
এই কমিশন নিজেকে এক নৈতিক অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে— যার দৃষ্টিতে মানবাধিকার একমাত্র পশ্চিমা সংজ্ঞা অনুযায়ীই সংরক্ষণ সম্ভব। এর ফলে পচিমা বলয়ের বিরোধিতাকারী সিরিয়া, ইরান, ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান, উত্তর কোরিয়া, চীন, রাশিয়া কিংবা মিয়ানমার-এর মতো রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে একতরফাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আজ একটি কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র। এর মাধ্যমে তারা সামরিক হস্তক্ষেপকেও ‘ন্যায্যতা’র মুখোশ পড়িয়ে বৈধ করার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ, লিবিয়া (২০১১), ইরাক (২০০৩)— দুটি দেশেই একই কৌশলে রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়।
মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো একপ্রকার “রাজনৈতিক বৈধতা” তৈরি করে দেয় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পক্ষে। যেমন: ইরান, ইরাক, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া—এদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের রিপোর্ট তৈরি করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়।
এই কমিশনের আওতায় পরিচালিত বহু এনজিও ও “সিভিল সোসাইটি” কার্যত একটি গোপন রাজনৈতিক কাঠামোর মতো কাজ করে। এরা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি, ধর্ম, আইন ও রাজনীতিকে ‘পুনর্গঠন’ করার প্রচেষ্টা চালায়।
“ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং” বা “অবজারভেশন মিশন” নামে যে সব টিম রাষ্ট্রের ভিতরে প্রবেশ করে, তারা শুধু রিপোর্ট লেখে না— বরং গোয়েন্দা ডেটাবেইজ তৈরি করে। বহু ক্ষেত্রে, এই তথ্য পরবর্তীতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার নিকট সরবরাহ করা হয়।
এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, USAID, NED— এইসব পশ্চিমা ফান্ডেড এজেন্সির অর্থায়নে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলো প্রশাসনের অভ্যন্তরে লবিং নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
“whistleblower” বা “নাগরিক সচেতনতা”র নামে সরকারবিরোধী তথ্য ফাঁস করে দেয়— যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা মিডিয়া ট্রায়াল সৃষ্টি হয়।
এই রিপোর্টগুলো আন্তর্জাতিক আদালত, নিরাপত্তা পরিষদ, এমনকি বিশ্বব্যাংক ও IMF-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলে।
সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও লবিংয়ের মাধ্যমে পশ্চিমা অনুগত একটি বলয় তৈরি করা হয়।
বিদেশি ফাউন্ডেশন ও এনজিওগুলো সামরিক অফিসারদেরকে “মানবাধিকার সচেতনতা”, “নাগরিক অধিকার রক্ষা”, “জেন্ডার ইকুয়ালিটি” ইত্যাদি নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়— যা বাস্তবে বাহিনীর ঐতিহ্যগত আদর্শ ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে।
“ডিপ স্টেইট” গঠনের মাধ্যমে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একটি বিকৃত নেতৃত্ব গড়ে তোলে, যারা দেশের মূল স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিদেশী স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তিগত স্বার্থের ভয় দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দুর্বল করে ফেলে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের ওপর অদৃশ্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালায় এই কাঠামো।
নারীবাদ, LGBTQ অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, মতপ্রকাশের নামে ধর্ম অবমাননা— সবকিছুই এই মানবাধিকার কাঠামোর ‘আধুনিক’ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। ফলে শরিয়াহর প্রয়োগকে “মানবাধিকার লঙ্ঘন” বলে চিত্রিত করা হয়।
এই গোটা কাঠামো আসলে এক ধরনের “নতুন উপনিবেশবাদ”— যার শাসক নেই, সেনা নেই, কিন্তু প্রভাব এতটাই গভীর, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে ব্যর্থ করে, প্রশাসনকে দ্বিধাগ্রস্ত করে, এবং পশ্চিমা মতাদর্শকে বাধ্যতামূলক করে।
এটাই হল ‘ডিপ স্টেইট’-এর সুশীল সংস্করণ, যা কাগজে কলমে “উন্নয়ন”, “মানবতা”, “স্বচ্ছতা” ইত্যাদির আড়ালে চালিয়ে যাচ্ছে একটি নীরব এবং পরিকল্পিত দখলযুদ্ধ।
সূত্র-আবু উসামা