| ৩০ জুন ২০২৫ |TBN desk |
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের (OHCHR) ঢাকায় কান্ট্রি অফিস খোলার প্রস্তাব ঘিরে উঠেছে নানামুখী প্রশ্ন ও উদ্বেগ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি জেনেভা থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে একটি খসড়া চুক্তি পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখন সর্বমহলে উত্তপ্ত আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রস্তাবিত কার্যালয়ের প্রেক্ষাপট OHCHR-এর কান্ট্রি অফিস মূলত স্থাপন করা হয় এমন সব দেশে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সিভিল ওয়ার, ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অথবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ১৭টি দেশে এই ধরনের অফিস পরিচালিত হচ্ছে—যেমন ইয়েমেন, সুদান, বুরকিনা ফাসো, তিউনিসিয়া ইত্যাদি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন কোনো গৃহযুদ্ধ বা জাতিগত সংঘাতের প্রমাণ নেই, বরং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও নিরাপদ একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের এমন এক পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের।
আন্তর্জাতিক চাপ ও আঞ্চলিক কূটনীতি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন শ্রীলঙ্কা ও নেপাল জাতিসংঘের একই প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলাদেশ যদি এই কার্যালয় স্থাপন করতে সম্মত হয়, তবে তা ওই দেশগুলোর ওপর আঞ্চলিক কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশকেই একটি “ভঙ্গুর রাষ্ট্র” হিসেবে চিত্রায়িত করার সুযোগ তৈরি হবে।
মানবাধিকার নয়, গোপন এজেন্ডা? বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘের এই অফিস প্রায়শই পশ্চিমা দাতা দেশগুলোর অর্থায়নে চলে, যারা নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মানবাধিকারকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এর আগেও অনেক দেশ এই ধরণের অফিসের মাধ্যমে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছে।
বিশেষভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই কার্যালয়ের মাধ্যমে LGTV এজেন্ডা-সহ নানা স্পর্শকাতর সামাজিক ইস্যুকে “মানবাধিকারের” নাম করে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হতে পারে, যা বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও নিরাপত্তা উদ্বেগ। বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ভূরাজনৈতিক ক্রসরোডে অবস্থান করছে—রোহিঙ্গা ইস্যু, মিয়ানমারের যুদ্ধ পরিস্থিতি, বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক শক্তির দখলদারী প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিষয় এ অঞ্চলকে অতি সংবেদনশীল করে তুলেছে। এর মধ্যে OHCHR-এর স্থায়ী উপস্থিতি দেশীয় নীতিনির্ধারণে আরও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত আদিবাসী আন্দোলন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে আন্তর্জাতিক মদত দিয়ে পুনরায় সক্রিয় করে তোলার শঙ্কা থাকছে। সুদান, তিউনিসিয়া, ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে।
জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান জরুরি। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে জনগণের মতামত উপেক্ষা করা হলে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হবে। এনজিও লবি বা কিছু আন্তর্জাতিক এজেন্টদের চাপেই যদি এই অফিস স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়, তবে সেটি হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ কখনোই পশ্চিমা “রংধনু সাম্রাজ্যবাদের” উপনিবেশে পরিণত হয়নি এবং হওয়ারও প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া জাতির আত্মপরিচয় ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট আত্মঘাত।
ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় স্থাপন কেবলমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং সমাজ-সংস্কৃতির ভবিষ্যতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি কেবল মানবাধিকার উন্নয়নের কথা বলে না, বরং আন্তর্জাতিক শক্তির একটি কৌশলগত উপস্থিতির বিষয় হিসেবেও সামনে এসেছে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন একটি জাতীয় ঐক্য ও স্পষ্ট অবস্থান—আমাদের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি যেন কোনো গোপন বৈশ্বিক এজেন্ডার পরীক্ষাগারে পরিণত না হয়।