গাজায় চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ভিন্নতর উপস্থাপনা এবং বিশেষত কিছু গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদনের বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। সম্প্রতি ‘প্রথম আলো’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গাজার বিক্ষোভের প্রকৃত কারণ ও প্রেক্ষাপটকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মূল কারণ এবং এর গতিপ্রবাহ ছিল ভিন্নতর, যা একপাক্ষিক উপস্থাপনার বিপরীতে বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরে।
গাজায় দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর টানা বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ, মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা গাজার সাধারণ জনগণের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, বেইত লাহিয়ায় হওয়া সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতির দাবি উত্থাপন এবং গাজাবাসীর উপর চলমান নিপীড়নের প্রতিবাদ জানানো।
প্রথম আলো তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, এই বিক্ষোভের একটি বড় অংশ হামাসবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। তবে আল জাজিরার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজার বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলো ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ সুগম করা। হামাসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেও, এটি কোনো সংঘটিত হামাসবিরোধী আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়নি।
বেইত লাহিয়ার বিক্ষোভের ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষ এ বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। কিছু পশ্চিমা মিডিয়া এটিকে হামাসবিরোধী আন্দোলন বলে প্রচার করতে শুরু করে, যা পরে ইসরায়েলি প্রচারণার অংশ হয়ে ওঠে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সাংবাদিক ইদি কোহেনসহ একাধিক পক্ষ সামাজিক মাধ্যমে এই বিক্ষোভকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে, যা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মূল উদ্দেশ্য ছিল গাজার জনগণের দুর্ভোগ তুলে ধরা। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য বাসেম নাঈম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের অধিকার রয়েছে যে, নিজের যন্ত্রণার কথা চিৎকার করে জানাবে। আমাদের প্রতিবাদী জনগণ যারা রাস্তায় বেরিয়েছে বা বের হয়নি, সকলেই আমাদের অংশ।’
গাজার অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ন্যায্য দাবি মানে দখলদার রাষ্ট্র ও তার অসৎ পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হওয়া নয়।’ এটি প্রমাণ করে যে, ফিলিস্তিনিরা তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য আওয়াজ তুললেও, এটি হামাসবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়নি।
ইসরায়েলি দখলদারিত্বের নৃশংসতা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ধামাচাপা দিতে এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকে দুর্বল করতে নানা অপপ্রচার চালানো হয়। গাজার অভ্যন্তরীণ সংকটকে ব্যবহার করে রাজনৈতিকভাবে বিভক্তি তৈরি করা দখলদার বাহিনীর দীর্ঘদিনের কৌশল। আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে মূল ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চালানো হয়।