নিজস্ব প্রতিবেদন, ১৫ আগস্ট ২০১৭।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শোক দিবস পালনের প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময়, মাত্র ৩০০ মিটার দূরে পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে বিকট বিস্ফোরণ। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। পরে, পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে খুলনার বিএল কলেজের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম।
কিন্তু সাত বছর পর এক স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। নিহত সাইফুলের বাবা আবুল খায়ের মোল্লার দাবি, তার ছেলে চাকরির খোঁজে ঢাকায় গিয়েছিল মাত্র ছয়দিন আগে। ঘটনার দিন সকালে পুলিশ এসে তাকে থানায় ডেকে নিয়ে যায়, সেখানেই তিনি টিভিতে দেখেন অভিযানের খবর। তাঁর অভিযোগ, “আমার ছেলেকে মিথ্যা জঙ্গি সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছে।“
আত্মঘাতী বিস্ফোরণ, নাকি পরিকল্পিত হত্যা?
পুলিশের অভিযোগপত্রে বলা হয়, আত্মঘাতী বিস্ফোরণে ভবনের দেওয়াল ভেঙে পড়েছিল, লোহার ফ্যান দুমড়ে গিয়েছিল। অথচ, ঘটনাস্থল থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সাইফুলের জাতীয় পরিচয়পত্র, টাকা ও মোবাইল ফোন! স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে—এমন তীব্র বিস্ফোরণে যদি দেওয়াল উড়ে যায়, তবে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কীভাবে অক্ষত থাকল?
একই তদন্তে উঠে এসেছে, এই ঘটনায় জঙ্গি তকমা দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৩ জনকে আসামি করা হয়। অথচ, তাঁদের অনেককে ঘটনার আগেই গুম করা হয়েছিল। মামলার এক নম্বর আসামি আকরাম হোসেন খান নিলয় ছিলেন মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁকে গুম করে চার মাস আটকে রাখা হয়, পরে তার পুরো পরিবারকেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
নির্যাতনের শিকার আরেক ভুক্তভোগী রাজমিস্ত্রি কামরুল ইসলাম শাকিলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও গুম করা হয় তাঁর শিশুসন্তানসহ। তিনি কারাগারে সন্তান প্রসব করেন। মামলার আরেক আসামি নাজমুল হাসান ওরফে মামুনকে ঘটনার আট মাস আগে বরিশাল থেকে গুম করা হয়, অথচ পুলিশের চার্জশিটে তাকে ঘটনার অন্যতম হোতা হিসেবে দেখানো হয়!
পুলিশি নির্যাতন ও সাজানো স্বীকারোক্তি
ভুক্তভোগীদের স্বীকারোক্তি আদায়ে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। আসামিদের বৈদ্যুতিক শক, ক্রসফায়ারের ভয়, এমনকি জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকিও দেওয়া হয়। এক আসামিকে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, “দেখছ, মিরপুরে কবুতর আব্দুল্লাহকে পরিবারসহ পুড়িয়ে মারা হয়েছে? আমাদের কথা না শুনলে তোমাকেও পরিবারসহ পুড়িয়ে দেব।”
সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম ও এসপি আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে এসব “জঙ্গি অভিযানের” বেশিরভাগই পরিচালিত হয়েছিল। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ ধরনের “ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন” ছিল তাদের পরিচিত কৌশল।
শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া
এই “অভিযানের” পর পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এর কৃতিত্ব নিতে যান। কিন্তু তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “এত কাছাকাছি জঙ্গি এনে অপারেশনের নাটক না করলেই পারতে!” শহীদুল হক নিজেই তার বইতে স্বীকার করেছেন যে, হাসিনা পুরো ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।
জবাবদিহিতার প্রশ্ন ও ন্যায়বিচারের দাবি
বর্তমানে সাবেক আইজিপি শহীদুল হক কারাগারে। মনিরুল ইসলাম ও আসাদুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা পলাতক। গুম, নির্যাতন ও সাজানো মামলায় নিরীহ মানুষদের জড়ানোর ঘটনায় ভুক্তভোগীরা এখন ন্যায়বিচারের দাবি তুলছেন।
একজন বিশিষ্ট আইনজীবীর মতে, “এইসব ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর উচিত ট্রাইব্যুনালে মামলা করা এবং সরকারের দায়িত্ব তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।”
প্রশ্ন থেকেই যায়—এই অভিযানের নামে কত নিরপরাধ মানুষকে বলি দেওয়া হয়েছিল? আর কতদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় এ ধরনের নাটক চলতে থাকবে?