ঢাকার বুকে ‘জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়’ স্থাপনকে কেন্দ্র করে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতক পর একটি বিদেশি দপ্তরের নামে এদেশে নজরদারির এমন কৌশলকে কেউই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না। এই কার্যালয় স্থাপন নিয়ে ইতিমধ্যেই সোচ্চার হয়ে উঠেছে ছাত্রসমাজসহ দেশপ্রেমিক জনগণ। তাদের অভিযোগ, এই অফিসের আড়ালে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে, মানবাধিকারের নামে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক ধর্মীয় মূল্যবোধে হস্তক্ষেপ করবে। অতীতে যেসব দেশে জাতিসংঘের এধরনের মানবাধিকার দপ্তর খোলা হয়েছে, সেখানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে আন্তর্জাতিক চাপ, সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করা, ও বিভিন্ন সঙ্কট উস্কে দেওয়ার নজির রয়েছে।
এই কার্যালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে যেমন বাড়তি নজরদারির ঝুঁকি তৈরি হবে, তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়নের শঙ্কাও প্রকট হবে। বিশেষ করে সমকামিতার স্বীকৃতি, ধর্মবিদ্বেষমূলক আইন সংস্কারের চাপ, এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ‘উন্নত দেশ’ বানানোর নামে মূল্যবোধবিরোধী ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, দেশের প্রচলিত আইন ও শাস্তির বিষয়েও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হতে পারে, যেমন মৃত্যুদণ্ড বাতিলের মতো ইস্যুতে বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ খুলে যাবে। এতে দেশের বিচারব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের উৎসাহিত করার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তড়িঘড়ি করে জাতিসংঘের এই কার্যালয় স্থাপন প্রকৃতপক্ষে সরকারের দূরদর্শিতার অভাব এবং দেশের স্বাধীন অস্তিত্বকে দুর্বল করার এক গভীর ষড়যন্ত্র। এই কার্যালয় খোলার ঘোষণার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে লেখা হয়েছে—“মানবাধিকার নয়, নজরদারি অফিস!”, “গাজায় যখন মানুষ মরে, মানবাধিকার কারা দেয়?”, “জাতিসংঘের নজরদারি মানি না, মানব না!”। এসব প্রতিবাদের ভাষা বলছে—দেশের মানুষ বোঝে, কীভাবে উন্নয়নের মোড়কে আসছে নতুন ঔপনিবেশিক ফাঁদ।
প্রশ্ন উঠেছে, স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরে বিদেশি সংস্থার এমন প্রভাব বিস্তারের অনুমতি দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের জনগণ বারবার প্রমাণ করেছে—তারা নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে জানে। ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপন শুধু একটি অফিস খোলা নয়, বরং এটি হলো ভবিষ্যতের এক নীরব আগ্রাসনের বীজ। যার মাধ্যমে দেশের সামরিক শক্তি, বিচারব্যবস্থা, সামাজিক নীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ—সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার এক ছদ্মপথ তৈরি করা হয়েছে। দেশপ্রেমিক জনগণ এই চক্রান্ত কখনোই মেনে নেবে না—এটাই ছিল রাজপথে গর্জে ওঠা জনতার ভাষা।
বিশ্বজুড়ে যেসব দেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর স্থাপন করেছে, সেসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—এই কার্যালয় শুধু মানবাধিকার দেখার অফিস নয়, বরং একটি দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের বৈধ চ্যানেল। আফগানিস্তানে কার্যালয় খোলার পর নারী অধিকার ও ধর্মীয় আইন সংস্কারের নামে পশ্চিমা চাপ সৃষ্টি হয়, যা দেশজুড়ে অস্থিরতা ডেকে আনে এবং শেষ পর্যন্ত তালিবান সরকারকে জাতিসংঘ তাড়িয়ে দেয়। সুদানে মানবাধিকার অফিস খোলার পর দেশজুড়ে জাতিগত সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের পথ উন্মুক্ত হয়। কলম্বিয়ায় অপরাধীদের দমন কার্যক্রমে বাধা দিয়ে মানবাধিকার দপ্তর কার্যত অপরাধীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের উপস্থিতি থাকার পরও গাজায় গণহত্যা থামেনি, বরং নিরপেক্ষতার নামে দখলদারদের সুযোগ করে দিয়েছে। গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও স্থানীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার’কে হাতিয়ার বানিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই নজিরগুলো দেখায়—OHCHR কার্যালয় কেবল মানবাধিকার দেখার অজুহাতে নয়, বরং দেশের আইন, সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় নীতি ও ক্ষমতার কাঠামোতেও হস্তক্ষেপ করে। আজ যদি বাংলাদেশেও তাদের পথ উন্মুক্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশীয় আইন প্রণয়ন, শাস্তি প্রদান, এমনকি ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়েও চাপ আসবে—যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটবে? নাকি এখনই এই ছদ্ম আগ্রাসনের দরজা বন্ধ করে, সার্বভৌমত্বের পাহারায় দাঁড়াবে? এই প্রশ্ন আজ কেবল রাজনীতির নয়, বরং প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের অস্তিত্বের প্রশ্ন।