রংপুর জেলার আটটি উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে গড়ে তোলা হাজারো সরকারি ঘর এখন আর গৃহহীন মানুষের মাথাগোঁজার ঠাঁই নয়। সেগুলো দখল করে নিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। শুধু দখল নয়—রাতে এসব ঘর ব্যবহার হচ্ছে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন বৈঠক, মাদক বেচাকেনা, এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে।
দ্য ব্যাঙ্গল নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রংপুরের তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, পীরগাছা ও সদর উপজেলা মিলিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয়েছে হাজার হাজার ঘর। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গৃহ ও ভূমিহীনদের জন্য ছয় হাজার ৫৪৮ জনের তালিকা তৈরি করে ধাপে ধাপে নির্মিত হয়েছে ঘরগুলো।
মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রথম থেকে পঞ্চম ধাপে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয় ছয় হাজার ১৩০ জনকে। প্রতিটি ঘরে রান্নাঘর, শৌচাগার, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা ছিল। প্রতি ঘরের নির্মাণ ব্যয় এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ চার হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ ঘর এখন ফাঁকা। কিছু ঘরে তালা ঝুলছে, আবার কোথাও থেকে ভেসে আসছে তীব্র মাদকের গন্ধ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকৃত গৃহহীনরা নয়, বরং আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজনই এসব ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। অধিকাংশেরই নিজস্ব ঘরবাড়ি আছে। প্রকৃত ভূমিহীনরা আজো খোলা আকাশের নিচে।
বদরগঞ্জের আকবর আলীর বরাদ্দ পাওয়া ঘর জবরদখল করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা মোখলেস আলী। যুবলীগের বাবলু দখল করে ভাড়া দিয়েছেন ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কাছে। একই চিত্র দেখা গেছে গঙ্গাচড়া, পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও সদর উপজেলাতেও।
মিঠাপুকুরের ওয়াজেদ আলী বলেন,
“আমরা আবেদন করেও ঘর পাইনি। বরাদ্দ পেয়েছে তারা, যাদের তিন-চারটা বাড়ি আছে। রাতে তাদের ঘরে মাদক চলে। দলের নিষিদ্ধ লোকেরা বসে ষড়যন্ত্রের বৈঠক।”
সাহেব মিয়া জানান,
“যে ঘর আমার প্রাপ্য ছিল, তা দখল করে এখন ওরা রাজনৈতিক কাজ করে। এসব এখন মাদক ব্যবসার ঘাঁটি হয়ে গেছে।”
জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তবে রাজনৈতিক চাপের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, এসব ঘর দখল ও অপরাধমূলক ব্যবহারের ফলে জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
এভাবে সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, দখলদারি ও অপরাধমূলক ব্যবহার চলতে থাকলে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের আস্থা হারাবে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের ওপর।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দ্যা ব্যাঙ্গল নিউজ