‘আই লাভ মুহাম্মাদ (ﷺ)’ লেখা পোস্টার নিয়ে প্রচারণা চালানোর জেরে ভারতজুড়ে অন্তত ৪,৫০৫ জন মুসলিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ২৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নাগরিক অধিকার সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস’।
গত ১০ অক্টোবর সংস্থাটি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর প্রদেশের বেরেলিতে মাওলানা তৌকির রাজা খানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ‘আমি মুহাম্মদ (ﷺ) ভালোবাসি’ লেখা পোস্টার প্রচারের পর থেকে মুসলিমদের ওপর ব্যাপক পুলিশি দমন ও প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। মুসলিমদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ, গণগ্রেফতার ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে, এবং এই সব পদক্ষেপ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পুলিশের ইচ্ছামতো করা হয়েছে।
সংস্থাটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমি মুহাম্মদ (ﷺ) ভালোবাসি’ ব্যানারে যে বিক্ষোভটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং কেবল একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়েছিল। মিছিলে কোনো স্লোগান, ভাঙচুর বা সহিংসতার ঘটনাও ঘটেনি। কিন্তু পুলিশ কোনো সতর্কতা ছাড়াই বলপ্রয়োগ করে, হঠাৎ লাঠিচার্জ করে ও মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের আটক করে।
ঘটনার পর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং ৪৮ ঘণ্টা ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের দুই দিন পর প্রশাসন বেরেলির মাজার পাহলওয়ান মার্কেটের ৩২টি দোকান সিল করে দেয়, যা একটি নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো নোটিশ বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই দোকানগুলো সিল করা হয়। স্থানীয় দোকানদারদের অভিযোগ, তারা নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতেন, কিন্তু প্রশাসন প্রতিশোধমূলকভাবে দোকানগুলো সিল করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ অক্টোবর পর্যন্ত বেরেলিতে অন্তত ৮৯ জন মুসলিমকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আরও অনেককে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, গ্রেফতারির কোনো মেমো দেয়া হয়নি, এফআইআরের কপি তাদের কাছে দেয়া হয়নি, আর পরিবারের সদস্যদের তাদের আত্মীয়দের অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে নাবালকও রয়েছে, তবে তাদের অবস্থান ও আইনি সহায়তা সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি।
তদন্তদল আরও জানিয়েছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভবন ভাঙা এবং সম্পত্তি সিল করা। এসব কাজের বেশিরভাগই ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময়ই করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়,, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জবাবে প্রশাসন আক্রমণাত্মক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিয়েছে। গ্রেফতার, নোটিশ ও আইনি প্রক্রিয়ার নিয়ম উপেক্ষা করা হয়েছে, যা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এছাড়াও প্রতিবেদনে অবৈধভাবে আটক সকল ব্যক্তির মুক্তি, এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও অন্যায্য গ্রেফতারের জন্য দায়ী অফিসারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর বরেলির ইসলামিয়া গ্রাউন্ড মসজিদের সামনে মাওলানা তৌকির রাজার আহ্বানে হাজারেরও অধিক মুসলিম ‘আমি মুহাম্মদ (ﷺ) ভালোবাসি’ লেখা পোস্টার নিয়ে প্রচারণা চালানোর সময় পুলিশ অকারণেই কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করে। ঘটনার পর পুলিশ ১০টি এফআইআর দায়ের করে। আটক করা হয় প্রায় ৫০ জন মুসলিমকে।
বেরেলির পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ। রাজ্যজুড়ে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
©Al Firdaws News