হাসপাতালই ছিল টর্চার সেল: সিহাব উদ্দিনের সেই রাতের সাক্ষ্য
২৪ জানুয়ারি ২০১৫। আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার দিন। রাজনৈতিক অস্থিরতার সেই সময়টিতে কাশিপুর এলাকায় জামায়াত–বিএনপির যৌথ পিকেটিং চলছিল। সেখান থেকেই গ্রেপ্তার হন ছাত্রনেতা সিহাব উদ্দিন। তার ভাষায়—“সেই রাতের স্মৃতি এখনো বুক কাঁপিয়ে তোলে।”
গ্রেপ্তার ও গণপিটুনি
সিহাব উদ্দিন জানান, পিকেটিং শেষে ফেরার পথে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সদস্যরা তাদের উপর হামলা চালায়। মারধরের একপর্যায়ে পুলিশ এসে উদ্ধার করলেও তা ছিল কেবল শুরু।
পুলিশ আহতদের খানঁপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে শুরু হয় আরেক দফা বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। তার বর্ণনায়—“ডাক্তার যেন চিকিৎসক নয়, একজন কসাই ছিল। মাথায় ১১টি সেলাই দেওয়া হলো—না অ্যানেসথেসিয়া, না ব্যথানাশক। হাত দু’টো হ্যান্ডকাফ দিয়ে বাঁধা, চিৎকার করাও নিষেধ।”
অস্থিরতায় নড়াচড়া করায় স্ট্রেচারের পায়ে পর্যন্ত হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়। সেলাই শেষে তাকে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার নিতে হয় রক্তাক্ত অবস্থায়ই।
কেবিনে নতুন নির্যাতনের অধ্যায়
পরবর্তীতে একটি কেবিনে নিলেও সেখানেই শুরু হয় পুলিশের জেরা ও টর্চার।
সিহাব জানান, তাকে ছাড়া বাকি দু’জন সহকর্মী মাহমুদ ও আবু সাইদ অচেতন ছিলেন। মাহমুদকে মৃত মনে করা হয়েছিল—ফিরতে সময় লাগে ৯ ঘণ্টা। আবু সাইদের জ্ঞান ফেরে ৪ ঘণ্টা পর।
কেবিনে পরিচিত-অপরিচিত বহু মানুষ ঢুকছিল। সিহাব বলেন, স্থানীয় একটি সংগঠনের এক ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে এসে তাকে ধমক দিয়ে বলেন, “এদের সেলাই দেওয়ার কী দরকার ছিল! এমনি ছেড়ে দিলেই ভালো ছিল!”
অন্যদিকে, আবু সাইদ তখন পুলিশের “ক্রসফায়ার টার্গেট”—নরসিংদী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পোষ্টারিং ছিল তার বিরুদ্ধে। কিন্তু টর্চারের আঘাতে মুখ বিকৃত থাকায় পুলিশ তাকে চিনতে পারেনি। সিহাবের ভাষায়—“রাখে আল্লাহ মারে কে—এটা নিজের চোখে দেখেছি।”
রাতভর একের পর এক টর্চার টিম
রাত বাড়তেই কেবিনটি পরিণত হয় এক ধরনের অস্থায়ী টর্চার সেলে।
প্রথমে ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ মণ্ডল এসে লাথি ও প্রশ্নবাণ চালান। এসআইরা থাপ্পড়, ঘুষি—“যার যা মন চাইছে তাই করছে।” এরপর তৎকালীন এসপি খন্দকার মহিদ উদ্দিন এসে লাঠি দিয়ে পাজরে আঘাত করেন।
তারপর আসে র্যাব, এনএসআই, ডিজিএফআই, এসবি—সব গোয়েন্দা সংস্থার টিম।
র্যাবের সদস্যরা সেলাইয়ের জায়গায় চাপ দেয়, বুকের উপর বসে জেরা করে।
সবচেয়ে ভয়ংকর আচরণ করে এসবি—প্রথমে মিষ্টি কথা, পরে নির্মমতা। তাদের একজন বলে—“তোর হাত খুব সুন্দর, এত সুন্দর হাত তোদের থাকা উচিত না।” তারপর সিহাবের বাম হাতের দুই আঙুল উল্টে ভেঙে দেয়।
ডাক্তারকে দেখানোরও সাহস হয়নি, কারণ সেই একই ডাক্তার অ্যানেসথেসিয়া ছাড়া ১১টি সেলাই দিয়েছিলেন। তাই নিজেই পায়ের গোড়ালি দিয়ে আঙুল জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেন—“একটা শব্দ হলো… বুঝলাম জায়গায় বসেছে।”
“জাহান্নামের মতো রাত”
নিজের অবস্থার বর্ণনায় সিহাব বলেন—
“সারারাত আল্লাহকে বলেছি—হে আল্লাহ, আমাকে মৃত্যু দাও বা জেলে পাঠাও… কিন্তু এই টর্চার আর না।”
তিনি দাবি করেন, তাকে কেন্দ্র করে গোয়েন্দারা বেশি ক্ষিপ্ত ছিল কারণ তিনি তখন ফতুল্লা থানা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
পরবর্তী অধ্যায় এখনো অজানা
সিহাব জানান, এটি তার অভিজ্ঞতার কেবল প্রথম অংশ। আরও আছে—
কীভাবে রিমান্ড থেকে বেঁচে ফিরলেন
মৃত্যুকে সামনে দাঁড়িয়ে দেখা
কীভাবে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়
ক্রসফায়ারের প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া হয়
গুমের প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়
মিডিয়া কীভাবে একজন ছাত্রনেতাকে ভিলেন বানায়
শেষে তিনি লেখেন—
“আপনাদের আগ্রহ থাকলে প্রতিটি ঘটনা আলাদা করে লিখবো, নাহলে এখানেই সমাপ্ত।”