নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) তথ্য কর্মকর্তা পদে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের সমন্বয়কদের ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে পরিচিত রাশেদুল ইসলাম ওরফে রাশেদ রাজন।
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগ কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই দেওয়া হয়েছে, যা ইউজিসির পূর্বের নির্দেশনার লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ইউজিসি এক চিঠিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডহক, মাস্টাররোল, নিরাপত্তাকর্মী ও আউটসোর্সিং ভিত্তিতে নিয়োগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলছেন, “রাশেদুল ইসলামকে কোনো বিশেষ কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।”
অফিস আদেশ অনুযায়ী, রাশেদুল ইসলামকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের ‘অনুসন্ধান কাম তথ্য অফিসার’ পদে ২২,০০০-৫৩,০৬০/- বেতনস্কেলের আওতায় মাসিক ২৩,১০০/- টাকা বেতনে ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাশেদুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক ও ২০২০ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে তার একাডেমিক ফলাফল খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়।
২০২৩ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজশাহীর কোর্ট স্টেশন এলাকায় নাশকতার অভিযোগে রাশেদুল ইসলামকে আটক করা হয়। পরে বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান। এরপর বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তাকে বৈছা সমন্বয়কদের ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের মতে, “কোনো দপ্তরে লোকবল সংকট থাকলে সেখানে নিয়োগের জন্য উপাচার্যের অনুমোদন লাগতে পারে। তবে অবশ্যই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়াই সঠিক পদ্ধতি।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি রাকিব হোসেন বলেন,
“এটি একটি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য এ নিয়োগ দিয়েছে।”
‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামের ফেসবুক গ্রুপে আহসান হাবিব নামে এক শিক্ষার্থী লেখেন,
“সরকারি চাকরিতে কোটা আন্দোলন করে ‘দুই হাজারের বেশি’ মানুষের জীবন উৎসর্গ করা হলো, আর এখন বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ‘সমন্বয়ক কোটা’ চালু করা হলো?”
এ বিষয়ে বৈছা সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন,
“আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। তার মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ রাহী বলেন,
“কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া কীভাবে প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়া হয়? এটি কি পুরস্কারমূলক নিয়োগ?”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন,
“উপাচার্যের নির্দেশে রাশেদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন,
“রাশেদুল ইসলাম মিডিয়া সম্পর্কে জানেন, তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি মনে করি, তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ পেয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।”
তবে এই নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে—বিশ্ববিদ্যালয় কি নতুন ধরনের কোটা প্রথা চালু করেছে? বিজ্ঞপ্তি ছাড়া এভাবে নিয়োগ দেওয়া কতটা ন্যায্য?