সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ‘পুনর্বাসন’-এর ঘোষণায় বাংলাদেশে এক ধরনের আশাবাদী প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে নীতিনির্ধারক ও কূটনৈতিক মহলে এ খবরে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা কি ততটাই সরল? রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব বাস্তবায়নের মতো কি আদৌ সক্ষমতা রয়েছে বর্তমান মিয়ানমার সরকারের?
বস্তুত, যে আরাকান অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেই এলাকাটি এখন আর সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তথ্য অনুযায়ী, আরাকানের প্রায় ৮০% ভূখণ্ড বর্তমানে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে প্রধানত আরাকান আর্মি শক্ত অবস্থানে রয়েছে, আর কিছু এলাকা রয়েছে আরসা (ARSA)-র নিয়ন্ত্রণে। কিছুদিন আগেই আরাকান আর্মি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটি শহরও দখলে নেয়—যা নতুন করে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে দেশের অভ্যন্তরেই। আরাকান তো বটেই, গোটা মিয়ানমার জুড়েই এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী অবস্থানে। সেনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ মূলত শহরকেন্দ্রিক সীমিত এলাকাজুড়ে, বাকিটা অনেকাংশেই অরাজক ও দখলকৃত। বাস্তবতা হলো, বর্তমানে মিয়ানমারে কার্যত বহু ক্ষমতা-কেন্দ্র বিদ্যমান—যারা একে অপরের সাথে সংঘাতে লিপ্ত।
এই জটিল বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকার যেন একধরনের দ্বিধার মধ্যে রয়েছে। একদিকে তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে, অন্যদিকে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করছে, আবার সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে—মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেও ‘আলোচনা’ অব্যাহত রয়েছে। এক অর্থে, বাংলাদেশ একসঙ্গে তিনটি পক্ষের সাথেই আলাপ-আলোচনায় নিযুক্ত, অথচ এই তিন পক্ষ নিজেরাই আরাকানে ত্রিমুখী সংঘর্ষে লিপ্ত।
অনেকে মনে করেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারতো তাদের আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করে অস্ত্র দিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে—আরসা নেতা জুনুনি সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন, যা রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ তৈরির আগে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—কে কাকে ফেরত নেবে? মিয়ানমার সরকার কি আদৌ আরাকানে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম, যেখানে তাদের প্রশাসনিক বা সামরিক উপস্থিতিই নেই?
এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত, “পুনর্বাসন” শব্দটি শুধু এক প্রকার কূটনৈতিক স্বস্তির ধোঁয়াশা ছাড়া আর কিছুই নয়।