।। TBN Desk ।। ২৯ মে ২০২৫ ।।
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন যেন একেবারে ছোট শিশুদের খেলনার মতো হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউটিউবের শর্ট ভিডিও, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের জন্য বিনোদনের উৎস না হয়ে হয়ে উঠছে এক ভয়ঙ্কর মানসিক বিষের মতো। অনেক অভিভাবকই জানেন না, শিশুদের এই ধরনের কনটেন্টে অতিরিক্ত আসক্তি ভবিষ্যতে তাদের মস্তিষ্ক ও চারিত্রিক বিকাশের উপর কী পরিমাণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউটিউব শর্টস, টিকটক এবং অন্যান্য শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, এইসব প্ল্যাটফর্ম শিশুদের মস্তিষ্কে এমন একধরনের আসক্তি তৈরি করছে যা মাদকের থেকেও ভয়ঙ্কর হতে পারে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল চিত্রের কারণে মনোযোগের ঘাটতি
শর্ট ভিডিওগুলোর বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত গতিতে বিভিন্ন দৃশ্য পরিবর্তন হওয়া, যাতে শিশুদের মনোযোগ কিছুক্ষণ পর পর নতুন উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। এর ফলে তাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন হিট’ তৈরি হয়, যা একধরনের আনন্দের অনুভূতি দেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই অব্যাহত উদ্দীপনা তাদের স্বাভাবিক মনোযোগ শক্তি হ্রাস করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শর্ট ভিডিও দেখা শিশুদের মধ্যে মনোযোগের স্থায়ীত্ব কমে যায়, ক্লাসে মন বসে না এবং তারা সহজেই অস্থির হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞান কী বলছে?
Harvard University-এর নিউরোসায়েন্স গবেষক ড. জর্ডান স্মিথ বলেন:“Short-form ভিডিওগুলো শিশুর Attention Span কে অস্বাভাবিকভাবে ছোট করে দিচ্ছে। তারা আর দীর্ঘ সময় কোনো কিছুতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না।” American Academy of Pediatrics বলছে:
“বাচ্চারা দিনে মাত্র ৩০ মিনিট শর্ট ভিডিও দেখলেও তাদের মস্তিষ্কের ‘Reward Center’ এমনভাবে উত্তেজিত হয়, যেটা নিয়মিত ড্রাগ ব্যবহারের মতোই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।”
Oxford Internet Institute এর গবেষণায় দেখা গেছে:
“যেসব শিশু নিয়মিত TikTok বা YouTube Shorts দেখে, তাদের IQ লেভেল ও আচরণগত স্থিতিশীলতা ২৫%-৩০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।”
শিশু বয়সে মোবাইল ব্যবহার শুরু ৩ বছর বয়স থেকেই ৬-১৬ বছরের শিশুদের মধ্যে ৮২% নিয়মিত ইউটিউব শর্টস দেখে। দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনটাইম ৭১% বাচ্চা। অল্প বয়সেই ১৮+ কনটেন্টে প্রবেশ ৬৫% শিশু ইতোমধ্যে টিকটকে ১৮+ কনটেন্ট দেখে। নেটভিত্তিক আসক্তির হার প্রতি ১০ জনে ৭ জন শিশু আসক্ত
ইউটিউবের ‘Auto Play’ ফিচার বাচ্চাদের থামতেই দেয় না। টিকটকের অ্যালগরিদম বাচ্চাদের সামনে অনৈতিক ও বয়ঃসন্ধিকালীন কনটেন্ট তুলে ধরছে। ছোট শিশুদের মাঝে অল্প বয়সে Selfie Culture, Narcissism, ও Sexualization বাড়ছে।
ডোপামিন লেভেল অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে। মেমোরি পাওয়ার ও মনোযোগ কমে যায়। বিবেকবোধ ও ধৈর্য হারিয়ে যেতে থাকে। কনটেন্টের অনুপযুক্ততা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়
বেশিরভাগ শর্ট ভিডিওর মধ্যে নেই কোনো শিক্ষণীয় বার্তা বা নৈতিকতা। বরং অশ্লীলতা, নকল কৌতুক, পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং অহেতুক উচ্ছ্বাসে ভরা এসব ভিডিও শিশুদের চরিত্র বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলে। অনেক শিশুই এসব ভিডিও দেখে ভাষা, পোশাক ও আচরণে অশোভন পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারা আর বই পড়ে না, ভালো গল্প শোনে না, বরং কেবল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায়
পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা
এই ভিডিও আসক্তি শিশুদের সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা, আড্ডা—সব কিছু কমে যাচ্ছে। এতে শিশুরা একধরনের আত্মকেন্দ্রিক ও ভার্চুয়াল বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠছে, যেটি ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অভিভাবকদের করণীয়
শিশুদের প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে বাঁচাতে অভিভাবকদের হতে হবে সচেতন। ইউটিউব কিডস-এর মত প্ল্যাটফর্মেও নজরদারি রাখতে হবে, সময় নির্ধারণ করতে হবে এবং সম্ভব হলে শিশুদের জন্য বই, খেলাধুলা, গল্প বলা, ইসলামী শিক্ষামূলক ভিডিওর প্রতি উৎসাহ দিতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো—অভিভাবকরাই যেন প্রযুক্তি ব্যবহারে ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে ওঠেন।
শিশুদের মস্তিষ্ক গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তাদের শৈশব। এই সময়েই যদি তারা ভুল কনটেন্টে আসক্ত হয়ে পড়ে, তবে তা পুরো জীবনের জন্য প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন ঘুমন্ত অভিভাবকদের জাগ্রত হওয়া, না হলে আগামীর সমাজ তৈরি হবে একদল মনোযোগহীন, আত্মকেন্দ্রিক ও বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন প্রজন্ম দিয়ে।
আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তাহলে একদিন পুরো প্রজন্ম মুঠোফোনে মস্তিষ্ক বিসর্জন দেবে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো বাচ্চাদের জন্য ‘ডিজিটাল বিষ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখনই সময় — STOP YouTube Shorts & TikTok for Kids!
সূত্র: Harvard Neuroscience Dept. Oxford Internet InstituteAmerican Academy of Pediatrics