২৮ মে ২০২৫, বুথিডং – এপিএন প্রতিবেদক:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি নিপীড়নের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA) বুথিডং টাউনশিপের রোহিঙ্গা বাসিন্দাদের মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২১ মে তারিখে AA যোদ্ধারা বুথিডংয়ের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত দিনেট প্যিন নামক গ্রামে প্রবেশ করে। তারা গ্রামের প্রশাসকসহ স্থানীয় রোহিঙ্গা বাসিন্দাদের একত্র করে একটি বৈঠক ডাকে। সেখানে কোনো লিখিত নোটিশ বা সরকারিভাবে অনুমোদিত নির্দেশনা ছাড়াই তাদের গ্রাম ছেড়ে যেতে মৌখিক আদেশ দেয়। হুমকি দেওয়া হয়, অবিলম্বে না গেলে “পরিণাম ভালো হবে না”।
AA জানিয়ে দেয়, গ্রামবাসীদের সাইন ন্যেইন প্যিন খালের ওপারে অবস্থিত একটি ধানক্ষেতে গিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে। সেখানে নেই কোনো আশ্রয়, খাদ্য কিংবা চিকিৎসা সহায়তা। ফলে বাস্তুচ্যুতরা চরম মানবেতর অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দিনেট প্যিন গ্রামটি এখন কার্যত জনমানবহীন, কারণ অধিকাংশ রোহিঙ্গা বাসিন্দা ভয়ে-আতঙ্কে এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। একজন বৃদ্ধ গ্রামবাসী বলেন, “আমাদের বলা হয়েছে ঘর না ছাড়লে আমাদের সাথে কী হবে, তার দায় আমরা নিজেরাই নিতে হবে। কে সাহস করবে এরপরও রয়ে যেতে?”
নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগএই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান জাতিগত নিপীড়নের ধারাবাহিকতাকেই স্পষ্ট করে। ২০২৪ সালের ১৮ মে, আরাকান আর্মি বুথিডং টাউনশিপের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয়, যার পর থেকেই সেখানে রোহিঙ্গাদের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ বাড়তে থাকে। তাদের চলাচল, কর্মসংস্থান এমনকি মৌলিক মানবাধিকারও ব্যাপকভাবে সীমিত করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং শরণার্থী সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ এখনও অনুপস্থিত।
মানবিক সহায়তার অভাব ও ভবিষ্যত শঙ্কাবাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বর্তমানে যেসব অস্থায়ী স্থানে রয়েছেন, সেখানে নেই কোনো ত্রাণ সংস্থা বা স্বাস্থ্যসেবা সংযোগ। নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, শিশুদের নেই কোনো খাদ্য কিংবা শিক্ষার সুযোগ। বর্ষাকালে এসব ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, তাদের ভবিষ্যত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আরাকান আর্মির এই কর্মকাণ্ড শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং জাতিগত নিধনের এক নতুন রূপ। তারা বেছে বেছে রোহিঙ্গা বসতিগুলোকে টার্গেট করে বাস্তুচ্যুতি ঘটাচ্ছে, যাতে এই জনগোষ্ঠী আর রাখাইন রাজ্যে নিজের পরিচয় ও অবস্থান ধরে রাখতে না পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সময় আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর হস্তক্ষেপের। শুধু বিবৃতি নয়, প্রয়োজন কূটনৈতিক চাপ ও মাঠপর্যায়ে হস্তক্ষেপ, যাতে এই বাস্তুচ্যুতি রোধ করা যায় এবং ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
সূত্র: রিপোর্টার:আরিফ হোসেন | আরাকান নিউজ নেটওয়ার্ক (ANN)স্থান: বুথিডং, রাখাইন রাজ্যArakan Desh TV