রংপুর, ২০ মে ২০২৫:
বর্তমান সময়ে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি এড়াতে রংপুরের অনেক অভিভাবক সন্তানদের সময়মতো বৈধ ও শালীনভাবে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে এই প্রবণতা পরিসংখ্যানে বাল্যবিবাহ হিসেবে প্রতিফলিত হলেও, এর পেছনে রয়েছে নৈতিক ও ধর্মীয় উদ্বেগ।
২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ কন্যাশিশু ১৮ বছরের পূর্বেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২১ সালে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ছিল ৩১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। দেশের গ্রামাঞ্চলে এই হার আরও বেশি—৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৫ বছর বা তার কম বয়সে বিয়ের হারও ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।
রংপুর বিভাগে বাল্যবিয়ের হার জাতীয় গড়কে ছাড়িয়ে গেছে। বিভাগজুড়ে বাল্যবিয়ের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, যেখানে রংপুর জেলায় ৫৩ দশমিক ৮ এবং লালমনিরহাটে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের ভিন্নতাও চোখে পড়ার মতো—রংপুর শহরে হার ৪০ শতাংশ, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে তা ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার (২০ মে) রংপুর মহানগরীর একটি হোটেলে জয়েন্ট অ্যাকশন গ্রান্ট প্রজেক্টের আয়োজনে ‘বাল্যবিয়ের পরিণতি ও করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় এই তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ধর্মীয় নেতা, কাজী, মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
পপি’র কনসোর্টিয়াম কো-অর্ডিনেটর কাজী আব্দুল্লাহ রিজভান বলেন, “অনেক সময় অভিভাবকরা সন্তানদের চরিত্র রক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে সময়মতো বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা কখনও কখনও বাল্যবিয়ের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে যায়।” ইউনিসেফের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় বাল্যবিয়েতে প্রথম এবং বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ধর্মীয় নেতারা উল্লেখ করেন, ইসলাম কখনও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জোরপূর্বক বিয়েকে সমর্থন করে না। তবে তারা বলেন, “সময়ের প্রেক্ষাপটে যদি সন্তানদের নৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে পরিবারের সচেতন সিদ্ধান্তে শালীন ও নিরাপদভাবে বিবাহের ব্যবস্থা করা যেতেই পারে।”
রংপুরে এই ‘সময়মতো বিয়ে’ প্রবণতার পেছনে অভিভাবকদের উদ্বেগ স্পষ্ট—তারা সন্তানদের যিনা ও অবৈধ সম্পর্কে না জড়িয়ে পড়ার পথ রুদ্ধ করতে চান।
তবে আলোচকরা মনে করেন, এই প্রবণতার পেছনে শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধ নয়, রয়েছে দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ ও সচেতনতার অভাব। বিয়ের বয়স নির্ধারণে কেবল আইন নয়, প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, পারিবারিক কাউন্সেলিং ও ইসলামী শিক্ষার বিস্তার।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, বাল্যবিয়ের ফলে মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যু, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অনেকেই বলেন, “এক শিশুর গর্ভে আরেক শিশু আসা শুধু পরিবার নয়, সমাজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।” তাই বিয়ের সময় নির্ধারণে ধর্মীয়, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
সামগ্রিকভাবে রংপুরে ‘সময়মতো বিবাহ’ প্রবণতা সমাজে একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে—একদিকে নৈতিক সুরক্ষার চেষ্টা, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও আইনগত ঝুঁকি। এর সমাধানে প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন, এবং দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব।
Source: TBN Desk