নিজস্ব প্রতিবেদন, ২৯শে মে ২০২৫
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী শহীদ আবরার ফাহাদকে হত্যা করা ‘জায়েজ’ ছিল—এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি শাহরিয়ার ইব্রাহিম। গত বুধবার (২৮ মে) নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে এক স্ট্যাটাসে তিনি এই মন্তব্য করেন। তার স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে একদিন আগে, মঙ্গলবার (২৭ মে) রাতে, যখন শহীদ আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “এ টি এম আজহারের মুক্তিতে শাহবাগের কণ্ঠে আজ পরাজয়ের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। একাত্তরের প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ চিরদিনের জন্য ধ্বংস করেছে এ শাহবাগই।”
এই স্ট্যাটাসের ওপর ভিত্তি করে বার্তা বাজার তাদের ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে। পরবর্তীতে শাহরিয়ার ইব্রাহিম সেই ফটোকার্ড নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করেন এবং লেখেন, “জাশির কুত্তা আবরার ফাহাদকে হত্যা কেন জায়েজ ছিল দেখ তোরা।”
তার এই বক্তব্য নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, ফেসবুকে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নেটিজেনরা মনে করছেন, একজন শহীদ শিক্ষার্থীকে নিয়ে এমন মন্তব্য শুধু অমানবিক নয়, বরং ছাত্রলীগের বর্বর আচরণেরই বর্ধিত সংস্করণ।
এই বিষয়ে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েম বলেন, “উন্মত্ত দানব শাহবাগের সাথে কেউ একমত না হলে শাহবাগ তাকে হত্যা করতে চায়। বুয়েটের শহীদ আবরার ফাহাদের ভাই আবরার ফাইয়াজ আজহারের মুক্তির পর শাহবাগের পরাজয় হয়েছে বলার পর ছাত্র ইউনিয়ন নেতার উক্তি—‘আবরার ফাহাদকে হত্যা কেন জায়েজ ছিল’—এটাই প্রমাণ করে।”
তিনি আরও বলেন, “শাহবাগের উন্মত্ত মব ছিল ফ্যাসিবাদের বীজ থেকে গজানো বিষাক্ত গাছ, যার প্রভাবে বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী জুলুম ও নিপীড়নের মধ্যে পড়েছে। এরা নিরপরাধের ফাঁসি তো চেয়েছিলই, একই সাথে নিরপরাধের ফাঁসি হওয়ার পরে অমানবিক ও উন্মত্ত রক্তখেকোর মতো উৎসবে মেতে উঠেছিল।”
হাসিনা-কে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ফলাফলে হাসিনা হয়েছিল, হিটলারের মতো উন্মত্ত খুনি, আর তার ল্যাসপেন্সার ছিল এরা। হাসিনা ফ্যাসিবাদী এবং কালচারাল ফ্যাসিস্টদের সংগঠনগুলো সেই ফ্যাসিবাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যারা মানুষের রক্তে পুষ্ট হচ্ছিল আওয়ামী শাসনকালের ১৬ বছর।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে সালমা তার প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, “লীগ আর বাম একই বৃন্তে দুটি ফুল। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আবরার ফাহাদকে নিয়ে এমন কটূক্তি করে, আর নতুন পুরাতন সব রাজনৈতিক দল তাদের শেল্টার দেয়, ছিঃ। আবরার ফাহাদের ত্যাগ ভারত এবং কালচারাল ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে আমাদের প্রেরণা জোগায়।”
আরেক শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম রফিক লিখেছেন, “ছাত্র ইউনিয়ন নেতা এভাবে ছাত্রলীগ কর্তৃক আবরার ফাহাদকে হত্যার বৈধতা দিচ্ছেন। বামরা ফ্যাসিবাদের দোসর না তারা হচ্ছে ফ্যাসিবাদের উৎপাদক। এদেরও বিচার হওয়া উচিত। ছাত্র ইউনিয়ন সক্রিয় থাকা মানে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের পতন হয়নি। ফ্যাসিবাদের উৎপাদক হচ্ছে ছাত্র ইউনিয়ন এবং ২০১৩ সালের শাহবাগ।”
সামগ্রিকভাবে এই ঘটনার পর মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে—বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল রাজনীতির মুখোশের পেছনে কী ভয়ঙ্কর মনোবৃত্তি লুকিয়ে আছে? শহীদ আবরারের মতো একজন নির্দোষ শিক্ষার্থীর হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার যে ধৃষ্টতা দেখানো হলো, তা শুধু অপরাধ নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির নগ্ন প্রকাশ।