বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত দুটি ইস্যু—ট্রান্সজেন্ডার সার্জারি ও রাজনৈতিক বিভাজনের পেছনে—একটি অভিন্ন সূত্রে বিদেশি শক্তির জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বহির্বিশ্বের ক্ষমতাধর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও তাদের দেশীয় সহযোগীদের পরিকল্পিত তৎপরতা একযোগে ধর্মীয় রাজনীতিকে দুর্বল করা ও সমাজে তথাকথিত ‘অগ্রসর সংস্কৃতি’র প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে—এমন আশঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে।
বাহ্যিকভাবে আধিপত্যবাদবিরোধী, ভিতরে বিদেশি শক্তির ম্যান্ডেট?বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের একদল ‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ অ্যাক্টিভিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী নিজেদের স্বাধীন চিন্তাবিদ ও প্রগতিশীল হিসেবে তুলে ধরলেও, অভিযোগ রয়েছে—তাঁরা প্রকৃতপক্ষে একটি বিশেষ বিদেশি শক্তির হয়ে মাঠে কাজ করছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিদেশি শক্তি ও তাদের দেশীয় এজেন্টরা সক্রিয় হয়ে ওঠে জামায়াতের উত্থান ঠেকাতে।
দুইটি কৌশলে তারা এগোয়:এক— যুদ্ধাপরাধের নামে জামায়াত নেতাদের বিতর্কিতভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা, যা পরে আওয়ামী লীগের হাত দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়।দুই— জামায়াতের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরিয়ে দলটিকে দুর্বল করা।
এই দ্বিতীয় কাজের দায়িত্ব নেন বামপন্থী নেতা ফরহাদ মজহার ওরফে গফুর এবং নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া ছোটন। রাতারাতি ধার্মিক চিন্তকের রূপ ধরে ফরহাদ মজহার জামায়াত ও হেফাজত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। নয়াদিগন্তে নিয়মিত লিখে ও লন্ডনে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে ইসলামী অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করেন।
পরিকল্পিতভাবে জামায়াতের তরুণদের আকৃষ্ট করতে ‘চিন্তা পাঠচক্র’ নামে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়, যেখানে ফরহাদ, গৌতম, পিনাকী, মুসতাইন জহিরসহ আরও অনেকে যুক্ত হন। এখানে জামায়াত-শিবিরের তরুণদের বোঝানো হয়—তোমরা স্মার্ট, ডায়নামিক; তোমাদের নতুন সেক্যুলার রাজনৈতিক শক্তি গড়া উচিত। জামায়াতের ৭১-এর দায় তোমাদের নয়—এই ধরণের বক্তব্য দিয়ে ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত করা হয়।
ভাঙন চালাতে দরকার ছিল ‘বিগ ফিশ’: দায়িত্ব পান মঞ্জুপ্ল্যান বাস্তবায়নে দরকার ছিল প্রভাবশালী কাউকে। তখন দিগন্ত টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন মুজিবুর রহমান মঞ্জু, যাঁর সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা বা রাষ্ট্রীয় রাজনীতি বিশ্লেষণের উপযুক্ত প্রস্তুতি ছিল না। ছোটন-ফরহাদদের ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে মঞ্জু হয়ে ওঠেন জামায়াত ভাঙন প্রকল্পের প্রধান চরিত্র। ফরহাদ মজহার তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ‘ট্রেইন আপ’ করেন, আর এভাবেই গঠিত হয় এবি পার্টি।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ রিজিডিটি, ২০১০ সালের শিবির ভাঙন, ও একাত্তরের ইস্যু ঘিরে দলত্যাগ—এসব কারণে মঞ্জুর জন্য একটি তরুণ গ্রুপকে মোবিলাইজ করা সহজ হয়ে যায়। এবি পার্টির ঘোষণায় ফরহাদ মজহারকে ‘প্রধান রাজনৈতিক গুরু’ হিসেবে তুলে ধরা হয়, গঠনতন্ত্র লেখেন মুসতাইন জহির, এবং ফান্ডিংয়ের বড় অংশ আসে ছোটনের হাত ধরে।
সবশেষে জানা যায়, পিনাকীর ঘনিষ্ঠ তিন সহযোগী হলেন ছোটন, মুসতাইন ও মঞ্জু। বাংলাদেশ থেকে পালানোর সময় মঞ্জুই পিনাকীকে সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ।
এই প্রেক্ষিতে ধারণা করা হচ্ছে—বাংলাদেশে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগঠন থাকলে, এবি পার্টিই তার জোরালো উদাহরণ। সব মানুষ সচেতনভাবে কোনো এজেন্সির এজেন্ট হয় না—কখনো কখনো একধরনের চিন্তার প্রভাবে পড়ে অনিচ্ছাকৃতভাবেও এই পথে অগ্রসর হয়। মঞ্জু সম্ভবত সে রকমই একজন, যিনি বিদেশি চক্রের ফাঁদে পড়ে জামায়াতকে দুই ফ্রন্টে দুর্বল করার অস্ত্র হয়ে উঠেছেন—একদিকে লীগ দিয়ে জামায়াত-বিএনপির শীর্ষ নেতাদের হত্যা, অন্যদিকে এবি পার্টি দিয়ে দলীয় ভাঙন।
ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে পিনাকী ও তাঁর সহযোগীদের ভূমিকাএদিকে একই ব্যক্তিবর্গ—বিশেষ করে পিনাকী ভট্টাচার্য ও তাঁর সহযোগীরা—ট্রান্সজেন্ডার (লিঙ্গ পুনর্নির্ধারণ) সার্জারি ও LGBTQ+ সংক্রান্ত ইস্যুতে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগেও বিদ্ধ হচ্ছেন। পিনাকী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরকারকে সমর্থন দিচ্ছেন, আবার তাঁর সংযুক্তি রয়েছে জর্জ সোরোসের সংস্থা FIDH‑এর সঙ্গে—যা বিশ্বব্যাপী LGBTQ+ নর্মালাইজেশন এজেন্ডায় অর্থায়ন করে থাকে।

সূত্র জুলকারনাইন সায়েরের অনুসন্ধানী আর্টিকেল