লেখক ও ব্লগার হত্যা মামলায় কম্পিউটার প্রকৌশলী মুজাম্মিল হুসাইন সাইমনকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সন্ত্রাস দমনের নামে নির্মম নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি এবং বিচার বিভাগীয় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ।
২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, রাজধানীর বাউনিয়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ কম্পিউটার প্রকৌশলী মুজাম্মিলকে তুলে নেয় সিটিটিসি (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম)। গ্রেপ্তারের ৪৮ দিন পর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসম্মুখে হাজির করা হয় এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। পুলিশ দাবি করে, তিনি ব্লগার অভিজিৎ রায়, জুলহাজ মান্নান ও দীপন হত্যাকাণ্ডে জড়িত।
তবে মামলার নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালে সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। মুজাম্মিলের পরিবার দাবি করেছে, তাকে এবং তার স্বজনদের ক্রসফায়ারের হুমকি ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে।
নির্যাতনের চিত্র চিঠিতে ফুটে ওঠেজেল থেকে পাঠানো এক চিঠিতে মুজাম্মিল লিখেছেন, গ্রেপ্তারের পর প্রথম মাসে তাকে চোখ, হাত ও পা বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়। পরে সিটিটিসি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে চলতে থাকে অমানবিক নির্যাতন—ইলেকট্রিক শক, শারীরিকভাবে ঝুলিয়ে রাখা, ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দেওয়া, এবং বারবার ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো।
চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘পুলিশ জানায়, প্রকৃত অপরাধীরা ইতিমধ্যে “ক্রসফায়ারে” নিহত হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে কাউকে দোষী বানাতে হবে।’
তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ড. জাফর ইকবালের সেক্যুলার দর্শনের বিরুদ্ধে মত দেওয়ায় তাকে ইসলামী দল বা সংগঠনের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যদিও তিনি কখনোই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
সাক্ষ্যপ্রমাণে দুর্বলতা, তদন্তে গড়িমসিআলোচিত অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডে প্রধান সাক্ষী ফটোসাংবাদিক জীবন আহমেদ বলেন, তিনি কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি। সাক্ষ্য দিতে এসে তিনি পুলিশের পক্ষ থেকে চাপের মুখে পড়েন। একই মামলায় অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তাকে কোনো কিছু না জেনেই সাক্ষ্য দিতে বলা হয়।
এছাড়া মামলায় উল্লেখিত সিসিটিভি ফুটেজে মুজাম্মিলকে দেখা যায়নি, জব্দকৃত ল্যাপটপ থেকেও কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্য পাওয়া যায়নি। মূলত ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিই রায়ের একমাত্র ভিত্তি।
পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধমুজাম্মিল দাবি করেন, সিটিটিসির সশস্ত্র কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে, প্রস্তুতকৃত খসড়ার ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেট তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। ওই খসড়া তার নিজের লেখা নয় বরং তদন্ত কর্মকর্তার রচিত। এই প্রক্রিয়ায় আরও ৫-৬ জনকে একই কায়দায় জড়ানো হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়াযুক্তরাষ্ট্রের ওহিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং স্কলার ও মানবাধিকারকর্মী মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, “পরিবারকে জিম্মি করে স্বীকারোক্তি আদায় করা একটি মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন। এসব মামলার নিরপেক্ষ পুনঃতদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহরিয়ার মাহমুদ বলেন, “শুধু স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কোনো দণ্ড দেওয়া সংবিধান ও বিচারনীতির পরিপন্থী। মুজাম্মিলের পরিবারের উচিত হাইকোর্টে রিট করা, জামিনের আবেদন করা এবং অভিযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।”
তদন্ত কর্মকর্তার বিব্রতকর অবস্থানসিটিটিসির তৎকালীন প্রধান ও মামলার শেষ তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, “সাইমন ভালো ছেলে, একসঙ্গে নামাজ পড়েছি।” তবে নির্যাতন ও গুমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি কিছু জানি না, অসুস্থ আছি এবং বর্তমানে ট্রেনিংয়ে আছি।”
পরবর্তী করণীয় ও উচ্চ আদালতের ভূমিকা২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, মুজাম্মিলের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ আল হোসাইন মামলার পুনঃতদন্ত ও স্বচ্ছ বিচারের দাবি জানান। তিনি বলেন, “এই মামলার রায় কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, এটি একটি কুখ্যাত বিচারবহির্ভূত সিদ্ধান্তের উদাহরণ।”
সূত্র: আমাদের দেশ পত্রিকা