এক সময় যিনি ছিলেন উম্মাহর রক্ষার সংগ্রামে অগ্রণী সৈনিক, সেই ওসামা বিন লাদেন তাঁর চতুর্থ পুত্র ওমর-কে মনে করতেন নিজের যোগ্য উত্তরসূরি। শৈশব থেকেই তাকে তৈরি করেছিলেন এক মুজাহিদের উত্তরাধিকার হিসেবে। কিন্তু সেই ওমর আজ ফ্রান্সের নর্মান্ডিতে পাশ্চাত্যের রঙ-তুলির জগতে ‘শান্তি’ খুঁজছেন।
ওমরের জন্ম ১৯৮১ সালে, সৌদি আরবে, ওসামার প্রথম স্ত্রী নাজওয়ার গর্ভে। কৈশোরে সে বাবার সঙ্গে কাটিয়েছে আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ে — যেখানে জুলুমবিরোধী সংগ্রামে অংশ নিচ্ছিলেন ওসামা। ওখানেই ওমরকে শেখানো হয়েছিল অস্ত্র চালানো, সাবলীলতা ছিল মুজাহিদদের মাঝে চলাফেরায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ওমর মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ওমর নিজেই বলেন, “আমার কুকুরের উপর রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়েছিল, আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম” — অথচ সে বুঝতে ব্যর্থ হয়, দুনিয়াজুড়ে মুসলিমদের উপর চলা অত্যাচারের প্রতিবাদেই এই সংগ্রাম।
২০০১ সালের এপ্রিল, অর্থাৎ ৯/১১-এর কয়েক মাস আগেই, ওমর আফগানিস্তান ছেড়ে দেয়। সে আল কায়েদার ঘাঁটি থেকে চলে যায় জাহেলিয়াতের জগতে — পশ্চিমা সভ্যতায়, যেখানে ইসলামিক আদর্শ নয় বরং ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিই সাফল্যের মানদণ্ড।
আজ সে ফ্রান্সের নর্মান্ডিতে চিত্রশিল্পী। তার কথায়, “আমি আর বাবার দুনিয়া সহ্য করতে পারছিলাম না”। অথচ সেই দুনিয়াই ছিল উম্মাহর মুক্তির প্রয়াসে পূর্ণ।
তার ক্যানভাস বিক্রি হয় সাড়ে আট লক্ষ টাকায়, কিন্তু আত্মিকভাবে সে যে কতটা শূন্যতায় ভুগছে, তা বোঝা যায় তার স্ত্রীর কথায়— “ওমর একদিকে বাবাকে ভালোবাসে, আবার তার পথকে ঘৃণা করে”।
আজ ওসামা বিন লাদেনের পরিবার ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমা মিডিয়া, হলিউড আর মডেলিং দুনিয়ায়। কেউ মডেল, কেউ শিল্পী— অথচ যার জন্য একজন মানুষ মাল্টিমিলিয়ন ডলারের জীবন ত্যাগ করে পাহাড়ে গিয়েছিলেন, তিনিই আজ ‘জঙ্গি’ বলে চিহ্নিত।
ওমর বলেন, “আমি জানি না কেন বাবা আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। হয়তো আমি বুদ্ধিমান ছিলাম, তাই আজও বেঁচে আছি।” এটা তার অহঙ্কার, না আত্মগ্লানি— তা স্পষ্ট নয়।
২০১১ সালের ২ মে, পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে মার্কিন সামরিক অভিযানে শাহাদাত বরণ করেন ওসামা বিন লাদেন। তাঁর জান্নাতবাস কামনা করে দোয়া করেন অনেক মুসলিম। মার্কিন বাহিনী দাবি করে, তাঁর দেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওমরের মতে, “তারা দেহ নিয়ে গেছে আমেরিকায়।”
এই হল এক ‘জিহাদি বংশধর’-এর করুণ পরিণতি — বাবা ছিলেন উম্মাহর মুক্তির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া একজন মুজাহিদ, আর ছেলে আজ পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে শান্তির খোঁজে বিভ্রান্ত পথযাত্রী।
“সত্যের পথে টিকে থাকা কঠিন, কিন্তু বিচ্যুতি যে আত্মার মৃত্যু — তা বহু দৃষ্টান্তে স্পষ্ট।”